নিজস্ব প্রতিবেদক |
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল সোমবার। এই অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; পাশাপাশি তারা ভবিষ্যতের সব নির্বাচন- জাতীয় সংসদসহ- থেকে অযোগ্য হবেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকাতেও থাকবে না।
রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে সমন্বিত নিরাপত্তা ছক তৈরি করা হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর সব এসপিকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে, আর ট্রাইব্যুনালের চারপাশে তৈরি হচ্ছে বহুস্তর নিরাপত্তা বলয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, রায়কে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা নেই, তবে অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় থাকবে। রাজধানীতে হোটেল-মোটেল, মেস ও বাসাবাড়িতেও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে; প্রয়োজনে অভিযান ও তল্লাশির প্রস্তুতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ গত ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয় ২৩ অক্টোবর, এরপর থেকেই রায় অপেক্ষমাণ ছিল।
গত ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর পলাতক অবস্থায় থাকা শেখ হাসিনা ও কামালকে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু আত্মসমর্পণ না করায় তাদের পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় খরচে তাদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ মামলায় ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মাহমুদুর রহমান এবং রাজনৈতিক নেতা নাহিদ ইসলাম। একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে আদালত একটি “দৃষ্টান্তমূলক রায়” দেবেন। তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ যে-ই করুক, আইন অনুযায়ী তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্র নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন মনে করেন, তার মক্কেলরা খালাস পাবেন। তিনি বিচারকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং বলেন, প্রসিকিউশন থেকেও তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার ঘোষণা দেয়, অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার ট্রাইব্যুনালেই হবে।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল গত এক বছরে আটটি মামলার তদন্ত সম্পন্ন করেছে; শেখ হাসিনাসহ তিনজনকে নিয়ে এই মামলাটি বিচারাধীন পাঁচ মামলার মধ্যে দ্বিতীয়।
ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, ১৭ নভেম্বর সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকবে। নাশকতা ঠেকাতে চেকপোস্ট, প্যাট্রলিং ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আগুনসন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি রোধে জেলার এসপিদের প্রতিদিনই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলে বিদ্যমান নিরাপত্তা জোরদারে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। র্যাব বলছে, ১৩ নভেম্বর লকডাউনের সময় যেমন তৎপরতা ছিল, রায় ঘিরেও একই মহড়া চলছে।