
লালমনিরহাট প্রতিনিধি │
ঝড়–বৃষ্টি–শীত কিংবা প্রখর রোদ—কোনো কিছুই থামিয়ে রাখতে পারেনি নুর ইসলামকে (৫১)। টানা ৩৪ বছর ধরে লালমনিরহাট শহরে বাইসাইকেল চালিয়ে নিয়মিত পত্রিকা বিলি করে আসছেন তিনি। বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের মৃত্যুর দিনেও স্থির থেকেছেন দায়িত্বে—বিলি করেছেন পত্রিকা।
লালমনিরহাট শহরের পূর্ব থানা পাড়ার বাসিন্দা নুর ইসলাম পৈতৃক সূত্রে পাওয়া তিন শতাংশ জমিতে ১৯৯১ সালে টিনের চৌচালা ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। পরে নিজের সঞ্চয় ও ধারদেনায় ২০০০ সালের দিকে আধাপাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। আর্থিক অনটনের কারণে তৃতীয় শ্রেণির পর লেখাপড়া এগোয়নি তাঁর।
পরিবারের পূর্বসূরিরাও ছিলেন পত্রিকা বিলির পেশায়। বাবা রকিব আলম ও বড় ভাই সাকির আলমকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নুর ইসলাম ১৯৯১ সালে পত্রিকা বিলির দায়িত্ব নেন।
স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে পাঁচজনের সংসার তাঁর। পত্রিকা বিলির আয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। ছেলে লালমনিরহাট সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন। বড় মেয়ে আদর্শ ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়নরত। ছোট মেয়ে সিপি স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী।
নুর ইসলাম বলেন,
“অভাবের কারণে আমি বেশি পড়তে পারিনি। কিন্তু আমার সন্তানদের যত কষ্টই হোক, তারা যতদূর পড়তে চায় আমি চেষ্টা করব পড়ানোর—ইনশা আল্লাহ।”
প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটায় তিনি বাসা থেকে সাইকেল চালিয়ে এজেন্টের কাছে পত্রিকা সংগ্রহ করেন। দুপুর দুইটার মধ্যে অধিকাংশ বিলি শেষ হয়। তিনটার মধ্যে অবশিষ্ট পত্রিকাও পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফেরেন। করোনার আগে তিনি দৈনিক ২০০টির বেশি জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পত্রিকা বিলি করতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে ২০০–র নিচে নেমেছে।
নুর ইসলাম বলেন,
“শহরের অফিস–আদালতে এখনো ছাপা পত্রিকা পড়া হয়। সাধারণ মানুষও নেন। তবে মোবাইলে পড়ার সুযোগ থাকায় পাঠক কমেছে, তাই আয়ও কমেছে। তবু এই পেশা ছাড়তে চাই না—এটাই আমার নেশা।”
লালমনিরহাট শহরের বাসিন্দা সুহাস চন্দ্র সরকার (৬৭) বলেন,
“১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলো প্রকাশের প্রথম দিন থেকে এখনো নুর ইসলাম নিয়মিত আমাদের বাসায় পত্রিকা পৌঁছে দেন। রোদ–বৃষ্টি–শীত–করোনার মাঝেও তিনি সাইকেল চালিয়ে হাজির থাকেন।”
প্রথম আলোর লালমনিরহাট এজেন্ট সাজিদ আলম বলেন,
“নুর ইসলাম তাঁর কাজে অত্যন্ত নিবেদিত। বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের মৃত্যুর দিনেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।”